ট্রু ট্রাশ – অনুবাদ

ট্রু ট্রাশ

মূল: মার্গারেট এটউড

অনুবাদ: সেলিম মিয়া


অন্যরা হৈ চৈ তোলে। প্রায়শ্চিত্ত! গল্পগুলোর মেয়েরা নিজেদের এমন বোকা বানায়। এরা খুব অবলা। অসহায়ভাবে ভুল মানুষের প্রেমে পড়ে। হার মানে। ছ্যাঁকা খায়। তারপর তারা কান্নাকাটি শুরু করে।

জোয়ান বলে, ‘অপেক্ষা করো। বড় রাতটা আসছে। এক নিঃশ্বাসে পড়ে যায়, ‘আমার মা তার এক কাস্টোমারকে ককটেল পোশাক দিতে গিয়েছিল। আমাদের জীর্ণ অ্যাপার্টমেন্টে আমি পুরো একা ছিলাম।‘

লিজ বলে, ‘হাঁপাচ্ছে, হাঁপাচ্ছে।‘

‘না, ওটা পরের ঘটনা। আমাদের জীর্ণ অ্যাপার্টমেন্টে আমি পুরো একা ছিলাম। সন্ধ্যাটা ছিল খুবই গরম এবং দম বন্ধ হয়ে আসার মতো। আমার পড়া উচিজানতাম। কিন্তু কিছুতেই আমার মন বসছিল না। ঠাণ্ডা বোধ করার জন্য গোসল দিলাম। তারপর, কী জানি মনে হলো— গ্রাজুয়েশনের ড্রেসটা পরার সিদ্ধান্ত নিলাম। এই ড্রেসটা অনেকগুলো রাত জেগে মা আমার জন্য বানিয়েছিল।‘

হিলারি সন্তুষ্টি নিয়ে বলে, ‘তা ঠিক। দোষের মধ্যে ঢালা। আমি হলে মাকে খুন করে ফেলতাম।‘

স্বপ্নটা ছিল গোলাপি…’

ট্রিশিয়া বলে, ‘কিসের গোলাপি স্বপ্ন?’

‘গোলাপি সময়ের স্বপ্ন। চুপ কর এখন। মায়ের ছোট্ট শোওয়ার ঘরে পুরো আয়নাটা জুড়ে আমি নিজেকে দেখলাম। ড্রেসটা আমার জন্য ঠিকই ছিল। আমার পাকা অথচ তন্বী দেহে পুরোপুরি মানিয়েছিল। এতে আমাকে ভিন্ন দেখাচ্ছিল। বেশি বয়স্ক, সুন্দর, যেন জীবনের প্রতিটা বিলাসিতায় অভ্যস্ত একটা মেয়ে। যেন রাজকুমারী। আমি নিজেকে দেখে হাসলাম। আমার রূপান্তর হয়েছিল।

‘সিঁড়িতে পায়ের শব্দ শুনে পিঠের হুকগুলো সবেমাত্র আলগা করেছিলাম ড্রেসটা খুলে রাখব বলে। কিন্তু খুব বেশি দেরি হয়ে গিয়েছিল। আমার মনে হয়েছিল যে, মা চলে যাওয়ার পর ভেতর থেকে দরজা লাগাতে আমি ভুলে গিয়েছিলাম। ড্রেসটা হাতে নিয়ে দরজার দিকে দৌড়ে গেলাম। চোরও তো হতে পারত। অথবা আরও খারাপ কিছু। কিন্তু না, এটা ছিল ডার্ক।‘

তোয়ালের নিচ থেকে অ্যালেক্স বলে, ‘ডার্ক হাঁদারামটা।‘

লিজ বলে, ‘ ঘুমাতে যা আবার।‘

জোয়ান কণ্ঠস্বর নিচু করে টেনে টেনে কথা বলে। “ ‘দুষ্টের মতো সে বলে, ‘ভাবলাম এসে তোমার সঙ্গ লাভ করব। তোমার মাকে তো বের হয়ে যেতে দেখলাম।‘ সে জানতো আমি একা! লজ্জায় আমার মুখ লাল হয়ে উঠছিল, আর কাঁপছিলাম। রক্ত যেন আমার শিরায় শিরায় আঘাত করছিল। কথা বলতে পারছিলাম না। শরীরটা ছাড়া মনটা বার বার তার সম্পর্কে আমাকে সতর্ক করছিল।“

স্যান্ডি বলে, ‘তো আর কী আছে? তোর তো অমন হওয়ার কথা না।‘

জোয়ান বলে, ‘এটা পড়তে চাস? চুপ কর তাহলে। ডার্ক বলল, ‘বর্মের মতো করে নরম গোলাপি ফিতাটা আমার সামনে ধরলাম।‘  ওর কণ্ঠস্বর ছিল রুক্ষ্ম ও পেলব। ‘কিন্তু এটা না পরলেই তোমাকে বরং বেশি ভালো দেখাবে।‘ ওকে দেখে আমার ভয় করছিল। ওর চোখদুটো জ্বলছিল, আর ছিল দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। ওকে মনে হচ্ছিল এমন একটা প্রাণী যে শিকারের পিছন পিছন যাচ্ছিল।“

হিলারি বলে, ‘খুব রগরগে।‘

স্যান্ডি বলে, ‘কোন ধরণের প্রাণী?’

স্টিফ্যানি বলে, ‘উইজেল।‘

ট্রিশিয়া বলে, ‘স্কান্ক।‘

লিজ বলে, ‘শ…’

জোয়ান পড়ে, ‘ওর কাছ থেকে আমি সরে এলাম। আগে কখনও এ রকম করে তাকাতে দেখিনি ওকে। সরতে সরতে দেয়ালে ঠেকে গিয়েছিলাম। আর ওর দু’বাহুতে আমাকে ও চাপ দিচ্ছিল। মনে হল ড্রেসটা নিচে পড়ে যাচ্ছে…’

প্যাট বলে, ‘সেলাইয়ের জন্যই এত কিছু।‘

…আর ওর হাতটা ছিল আমার বুকের ওপর। শক্ত মুখটা আমার মুখকে খুঁজছিল। আমার জন্য ও যে ভুল মানুষ ছিল সেটা জানতাম। কিন্তু কিছুতেই প্রতিহত করতে পারছিলাম না। আমার সমস্ত শরীর ওর শরীরের জন্য পাগল হয়ে গিয়েছিল।‘

‘কী বলল?’

‘বলল যে, এই. শরীর, এখানটার ওপরে!’

‘শ…’

‘মনে হচ্ছিল আমাকে ওপরে তুলল। তুলে সোফায় নিয়ে গেল। তখন ওর শক্ত, পেশীবহুল পুরো শরীরটাকে আমার শরীরে চাপ দিচ্ছিল মনে হল। ওর হাতদুটো একটু সরাতে চেষ্টা করলাম আমি। কিন্তু আসলে তা চাইনি। আর তারপর… আমরা একাকার হয়ে গেলাম। পুরাপুরি একাকার। বিস্ময়সূচক চিহ্ন।‘

এক মুহূর্তের নীরবতা। তারপর পরিচারিকারা হেসে ওঠে। হাসিটা আঘাতমূলক ও অবিশ্বাসজনক। একাকার। এ রকম। আরও কিছু থাকতে হবে।

জোয়ান তার সাদামাটা স্বরে বলে, ‘ড্রেসটাই নষ্ট। এখন মা বাসায় আসবে।‘

হিলারি চটপট করে বলে, ‘আজ আসবে না। আমাদের হাতে দশ মিনিট মাত্র সময় আছে। আমি সাঁতার কাটতে যাচ্ছি। গা থেকে এই তেল ছাড়াতে হবে।‘ উঠে দাঁড়ায় সে। সাদা চুলগুলোকে  ক্লিপ দিয়ে আটকে পিছনে রাখে। খেলোয়ারদের মতো তামাটে শরীরটাকে প্রসারিত করে। আর ডকের ও প্রান্তে রাজহংসীর মতো করে ডুব দিয়ে চলে যায়।

স্টিফ্যানি বলে, ‘কার কাছে সাবান আছে?’

গল্পটা বলার সময় রনেট কিছুই বলেনি। অন্যরা যখন হো হো করে হেসেছে, তখন সে শুধু মৃদু হাসি দিয়েছে। এখন সে তেমন হাসছে। তার হাসিটা কেন্দ্র-দূরবর্তী হাসি: বিভ্রান্ত, একটু অনুতাপজনক।

জোয়ানকে সে বলে, ‘হ্যাঁ, কিন্তু এটা হাসির কেন?’

খাবার ঘরের চারদিকে স্টেশনগুলোতে পরিচারিকারা দাঁড়ায়। হাতগুলো সামনে মুষ্টিবদ্ধ করে রাখে। আর মাথাগুলো রাখে নিচু করে। তাদের রাজকীয়-নীল ইউনিফর্মগুলো সাদা মোজার প্রায় ওপরে এসে পড়ে। মোজাগুলোর সাথে পরে আছে হরিণের সাদা-কালো চামড়ার জুতা কিংবা সাদা স্নিকার। ইউনিফর্মের ওপরে পরেছে সাদা অ্যাপ্রোন। ক্যাম্প অ্যাডানাকিতে ঘুমানোর জন্য এবড়ো-থেবড়ো কাঠের ক্যাবিনগুলোতে কোনও বৈদ্যুতিক বাতি নেই। টয়লেটগুলো ঘরের সাথেই। ছেলেরা তাদের নিজের কাপড়-চোপড় ধোয়, তবে সিঙ্কে না, লেকে। পরিচারিকারা ইউনিফর্ম ও অ্যাপ্রোন পরে থাকে। এভাবে কষ্টে-সৃষ্টে থাকলে একটা ছেলের চরিত্র গঠিত হয়। কিন্তু তাও বিশেষ ধরণের থাকা।

খ সাহেব খাবারের জন্য কৃতজ্ঞতাস্বরূপ ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করছেন। ক্যাম্পটার মালিক তিনিই। আর শীতের সময়গুলোতে সেন্ট জুডের ক্যাম্পেরও ধর্মগুরু। চামড়ার মতো শক্ত ও সুন্দর মুখাবয়ব তার। বে স্ট্রীট আইনজীবীর মতো সুন্দরভাবে ছাঁটা সাদা চুল। আর চোখদুটো যেন বাজপাখির চোখ: সবই দেখে, কিন্তু শুধু মাঝে মাঝে ছোঁ মারে। আজকে পরে আছেন ইংরেজি ভি-আকৃতির গলাবিশিষ্ট সাদা টেনিস সোয়েটার। তিনি জিন ও টনিক পান করতে পারতেন। কিন্তু করছেন না।

তার মাথার ওপরের দেয়ালে পিছনটায় কালো গথিক অক্ষরে চিত্রিত একটা মলিন তক্তা আছে। সেখানে লেখা অ্যাজ দ্য টুইগ ইজ বেন্ট। তক্তাটার প্রত্যেক পাশে এক টুকরো সাদাটে পানি-বাহিত কাঠের সজ্জা আছে। আর এর নিচে আছে আড়াআড়ি করে রাখা দুটো লগি এবং পাইক মাছের একটা বিশাল মাথা, যার মুখটা খোলা আছে সুচাকৃতির দাঁতগুলো দেখানোর জন্য। মাছটির কাচের মতো একটা চোখ হিংস্র উম্মত্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে।

খ সাহেবের বাম পাশে জানালাটা এসে শেষ হয়ে গেছে। এর অপর প্রান্তে আছে অসীম পর্যন্ত বিস্তৃত স্মৃতিভ্রংশের মতো নীল জর্জিয়ান বে। এই বে থেকে উঠে এসেছে তিমির পিঠের মতো,  গোল হাঁটুর মতো, বিশালদেহী ভাসমান রমনীদের উরু ও হাঁটু থেকে গোঁড়ালির পিছন দিকের মতো কিছু দ্বীপ। দ্বীপগুলো গোলাপি শিলার। হিমবাহে শিলার গায়ে ফাটল ধরে গেছে, গোলাকার হয়েছে, আর উপরিভাগে রয়েছে আঁচড় কাটা। বড় বড় শিলায় আঁকড়ে আছে কয়েকটা জ্যাক পাইন গাছ। গাছগুলির শিকড় ফাটলের মধ্য দিয়ে চলে গেছে। এসব দ্বীপপুঞ্জের মাধ্যমেই  পরিচারিকারা এখানে ফেরি পার হয়ে এসেছিল। তীর থেকে বিশ মাইল হবে। এসেছিল ভারী মেহগনির তৈরী লঞ্চে করে। এ লঞ্চের মাধ্যমেই চিঠিপত্র, খাবার সামগ্রীসহ অন্য সব কিছু এ দ্বীপে আনা হয়। আনা হয় এবং নিয়ে যাওয়াও হয়। কিন্তু গ্রীষ্মের শেষ  না হওয়া পর্যন্ত পরিচারিকাদের মূল ভূখণ্ডে নিয়ে যাওয়া হবে না। কারণ এটা অনেক দূর। এক দিন লেগে যাবে। তাছাড়া, রাতের বেলা তাদের কখনও দূরে থাকতে দেওয়া হবে না। তাই এখানে তারা আছে পুরো সময়টা। খ সাহেবা ও ডায়েটিশিয়ান মিস ফিস্ক ছাড়া দ্বীপটিতে মহিলা বলতে শুধু তারাই। কিন্তু তারা দুজনেই বয়স্ক। তাই গোনায় পড়ে না।

নয় জন পরিচারিকা হবে। সব সময়ই নয় জন। ডনি, যে আট বছর বয়স থেকেই এ ক্যাম্পে আসছে, সে ভাবে, শুধু নাম ও মুখ বদলায়। আট বছর বয়সে বাড়ির জন্য মন কাঁদার সময়টা ছাড়া পরিচারিকাদের দিকে সে কোনও মনোযোগ দেয়নি। তারপর তারা বাসন-কোসন ধুতে গেলে সে রান্নাঘরের জানালাটা অতিক্রম করার ছুঁতোর কথা চিন্তা করত। তারা সেখানে নিরাপদে অ্যাপ্রোন পরে কাচের পিছনে নিরাপদে থাকত। যেন নয়টা মা। ডনি তাদের আর মা হিসেবে ভাবে না।

রনেট আজকে ডনির টেবিল সাজাচ্ছে। অর্ধ-নিমীলিত চোখের পাতায় ডনি দেখছে রনেট তার সরু মুখখানি ফিরিয়ে নিচ্ছে। ডনি একটা কানের রিং দেখতে পায়। সোনার তৈরী ছোট্ট একটা বৃত্ত। বৃত্তটা রনেটের কানের ঠিক মাঝ বরাবর গেছে। ডনির মা বলে, শুধু ইটালিয়ান এবং সস্তা মেয়েরাই কানে ফুটো করে। কানের মধ্য দিয়ে ফুটো করাটা বেদনার ব্যাপার। এতে সাহস লাগে। ডনি ভেবে পায় না রনেটের রুমের ভেতরটা কিসের মতো দেখতে, আর সস্তা, মজার মজার কী কী জিনিস আছে সেখানে। হিলারির মতো কেউ হলে ডনি এতটা ভাবত না। কারণ সার্জারিতে ব্যবহৃত যন্ত্রপাতির মতো ড্রেসারে রাখা পরিষ্কার চাদর, তাকের সারি সারি জুতা, চিরুনী, ব্রাশ, প্রসাধনীর কথা সে তো জানেই।

রনেটের অবনত মাথার পিছনে আছে র্যাটল সাপের বড় একটা চামড়া। চামড়াটা দেয়ালের সাথে পেরেক মেরে রাখা হয়েছে। এই র্যাটল সাপকেই এখানটায় দেখা যাবে। এছাড়া পয়জন আইভি, বজ্রসহ বৃষ্টি ও ভরাডুবি দেখতে পাবেন আপনি। বাচ্চা-কাচ্চায় ভরা পুরো একটা ক্যানো নৌকা গত বছর ডুবে গিয়েছিল। কিন্তু বাচ্চারা ছিল অন্য ক্যাম্পের। প্রত্যেককে মেয়েলী লাইফ-জ্যাকেট পরানোর ব্যাপারে কিছু কথাবার্তা হয়েছে। মায়েরাই এটা চায়। ডনির নিজের একটা র্যাটল সাপের চামড়া চাই। তার বিছানার ওপরে পেরেক দিয়ে বেঁধে রাখবে। কিন্তু খালি হাত দিয়ে গলা টিপে নিজে সাপ ধরে মাথাটা আলাদা করলেও চামড়াটা রাখার জন্য সে কখনো অনুমতি পায়নি।


১ম পর্ব                                                                                                                             ৩য় পর্ব

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*