বিমূর্তীকরণ

নিবন্ধ

বিমূর্তীকরণ

-শাহিনুর ইসলাম


বিমূর্ত শিল্প হচ্ছে তা-ই যা মূর্ত না, যা বাস্তবকে অবিকল চাক্ষুষরূপে চিত্রায়িত করে না। তা কেবলমাত্র আকার, আকৃতি, রেখা ও রঙের মাধ্যমে বস্তুজগতের ভাববৈশিষ্ট্য ও গুণাবলী সংচিত্রণের প্রয়াস চালায়। এখানে উদ্দিষ্ট বস্তুর কোন নিজস্ব পরিচয় থাকে না – সেখানে থাকে বস্তুর গুণধর্ম ও আকার। তাই বিমূর্ত শিল্পকে বলা হয় non-representational এবং যেহেতু তা-তে figure বর্তমান থাকে না সেহেতু বলা হয়- non-figurative. সঙ্গীত বিশেষত ভারতীয় রাগসঙ্গীত এই বিমূর্তীকরণের চূড়ান্ত অবস্থা। কেননা সেখানে দৃশ্যযোগ্য বা স্পর্শণযোগ্য কোন বস্তু নেই। সে কারণেই সঙ্গীতকে বলা হয় বিশুদ্ধতম এবং ন্যূনতম প্রতীকবহ শিল্প। সঙ্গীত দুই রকমভাবে ভাব প্রকাশ করে- বিশুদ্ধ সঙ্গীতের আকারে এবং কাব্যের সঙ্গে মিশ্রিত হয়ে। কথা বা কাব্যের দ্বারা সঙ্গীতকে মূর্তরূপ দেয়ার প্রচেষ্টা চলে মাত্র। তথাপি হিন্দুস্থানী সঙ্গীতের ক্ষেত্রে বাক্য বা কথা অতি তুচ্ছ। সঙ্গীত সেখানে স্বতন্ত্র অবস্থায় রিাজমান, সে তার স্বরূপকেই অভিব্যক্ত করে। রাগ সঙ্গীতের ভাব রাগের দ্বারাই প্রকাশিত হয়। আবার ভাবকে প্রাধান্য দিতে আলাপে বা তানে অনেক ক্ষেত্রে রাগের শৈথিল্য দেখা যায়। রাগ সঙ্গীতে রাগ মূখ্য হলেও সেই রাগের পরিবেশনার প্রথম লক্ষ্যই হল রাগের ভাবমূর্তিকে প্রকাশ করা।

চিত্রকলায়ও বিমূর্তীকরণ রয়েছে সেই প্রাচীনকাল থেকেই। তথাপি উনবিংশ শতাব্দীতে ডারউইন, সিগমণ্ড ফ্রয়েড, কার্ল মার্কস প্রমুখ বিজ্ঞানীদের যুগান্তকারী তত্ত্বের ফলে মানুষের দীর্ঘকালের বিশ্বাসের ভিত নড়ে যায়। ধর্মবিশ্বাস উবে যেতে আরম্ভ করে। ফলে এক ধরনের শূন্যতাবোধের সৃষ্টি হয়। এই শুন্যতাবোধ মানুষকে এক ধরনের হতাশায় নিমজ্জিত করে, কারণ মানুষ সেই শুন্যতাকে পূরণ করার বিকল্প কিছু পাচ্ছিল না। তদুপরি জ্ঞান-বিজ্ঞানের নানা যুগান্তকারী আবিস্কারের দরুণ আধুনিক জীবনের সামাজিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক পরিস্থিতিতে জটিলতার জন্ম নেয়। ফলত নিঃসঙ্গতা, হতাশা ও বিচ্ছিন্নতাবোধ- আধুনিক মানুষের জীবনে ট্রিলজি হিসেবে দেখা দেয়। এই ট্রিলজিই আধুনিক যুগে বিমূর্ত শিল্পের পশ্চাতে অনেক প্রভাব বিস্তার করে রেখেছে।

আলোকচিত্রণে প্রথমেই বিমূর্ত অবস্থাটা থাকে latent image হিসেবে পরিস্ফুটনের আগের সময়টাতে। সেই অদৃশ্য ছবি যখন দৃশ্যমান হয় তখন বলা হয়- the latent image is reduced to a visual image. এই বিমূর্ত অবস্থা থেকে মূর্ত রূপে আসা মানেই তা এক ধরনের reduction। রঙীন ছবির কথা বাদ দিলেও, কোন বস্তুর শাদা-কালো ছবি সেই বস্তুর বর্ণহীনতাকেই নির্দেশ করে। বস্তু জগতে যে বর্ণবাহার দৃশ্যমান শাদা-কালো ছবিতে তা বিলোপ পায়। তাই শাদা-কালো আলোকচিত্রও এক ধরনের বিমূর্ত অবস্থা। শাদা-কালো ছবিতে বিমূর্ত গুণ থাকা সত্ত্বেও তা অন্যান্য দৃশ্যশিল্প এমনকি রঙীন আলেকচিত্র অপেক্ষা অনেক বেশি সহজবোধ্য, সর্বজনীন ও অধিকতর আনন্দপ্রদ। শ্রেষ্ট আলোকচিত্রীদের শাদা-কালো ছবিগুলো তার উৎকৃষ্ট উদাহরণ। এই শাদা-কালোতে থাকে অন্যান্য রঙের অন্তর্নিহিত সারোৎসার।

রঙীন আলেকচিত্রণেও বিমূর্ত রপ প্রকাশ করা যায়। সেখানে ভাব থাকে দৃশ্যজগতের অনুভবের রেখায়। বিমূর্তকে প্রকাশের বেলায় বিষয়বস্তু গৌণ এবং আকার বা রূপ প্রধান হিসেবে থাকে। এই রূপরীতিতে আবার বিশেষ করে জ্যামিতিকতার প্রাধান্য- রঙ এর পরিবর্তে কাঠামো, প্রাকৃতিক বৈচিত্র্য এর বদলে জ্যামিতিক আকার প্রধানরূপে থাকে। বিমূর্ত ভাব, রূপ বা অবস্থা আমাদের মনে বিভিন্ন অনুষঙ্গ জাগ্রত করে বলে বিমূর্ত অনেক সময় প্রতীকীও। বিমূর্ত শিল্পে সামাজিক, সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক ইত্যাদির প্রভাব পরোক্ষভাবে বিদ্যমান থাকে।

একজন আলোকচিত্রী যে পরীক্ষা-নিরীক্ষায় আগ্রহী হয়ে ওঠেন, তার পেছনে অনেক কারণ থাকে। প্রথমত, ভিন্ন প্রতিচ্ছবি সৃষ্টি করার বিমল আনন্দ। দ্বিতীয়ত, আঙ্গিক, কলাকৌশল বা উপাদানের দিক থেকে মাধ্যমটির সম্ভাবনা বাড়ানোর প্রয়াস। তৃতীয়ত, কোনো মৌলিক, সৃজনশীল কিংবা একান্ত নিজস্ব ধারণাকে শিল্পরূপ দেওয়া। এ-সব কারণ একজন আলোকচিত্রীকে ঠেলে দেয় অন্যান্য ক্ষেত্রের সঙ্গে বিমূর্ত আলোকচিত্রণের জগতে। তখন আলোকচিত্রণ যতোটা না নান্দনিক বা সামাজিক অনুষঙ্গ, তার চেয়ে বেশি অনুভবের অভিনব উপায় হয়ে দাঁড়ায়। বিমূর্ত আলোকচিত্র প্রথম গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিল যখন সৃষ্টিশীল দৃষ্টিভঙ্গির অধিকারী শিল্পীরা দৃশ্যের বদলে দৃশ্যগত অভিজ্ঞতা, নিছক বস্তুর বদলে বিভিন্ন বস্তুর মধ্যকার সম্পর্ক ও বাস্তবতার উপর নির্ভর না করে জ্যামিতির উপর গুরুত্ব দিয়েছিলেন। এর ফলে আলোকচিত্রে বিধৃত বস্তুটি আকার, আয়তন, বুনোট, রেখা ও নকশা নিয়ে হাজির হয় ।

অনুভূতির ভাষা যেমন বিমূর্ত, তেমনি শব্দও (word) প্রাথমিক অবস্থায় বিমূর্ত থাকে। বস্তুর জন্য আরোপিত কোন শব্দ যেমন- ‘নদী’ বলার সঙ্গে সঙ্গে আমাদের চেতনায় এসে নদী ধারণাটি হাজির হয়। তার আগে সে বিমূর্ত রূপে বিরাজ করে। তেমনি আমাদের মনে প্রতিটি প্রজাতির একটি সাধারণ রূপকল্প থাকে, যার সাহায্যে আমরা বস্তুকে অন্যান্য বস্তু থেকে সনাক্ত করতে পারি। উদাহরণস্বরূপ, ‘পাখি’ শব্দটি বলার সঙ্গে সঙ্গে আমাদের চেতনার দরজায় পাখির সাধারণ বিমূর্ত চিত্রকল্পটি এসে করাঘাত করে। পরবর্তীতে যখন বস্তুজগতে কোন পাখি দেখি তখনই আমাদের মন সজাগ হয়ে ওঠে ও তাকে সনাক্ত করে। মানব মন অধ্যুষিত এই বিমূর্ত ভাব-অনুভাব ও ধারণাগুলো শিল্পের বিভিন্ন মাধ্যমে কখনো রঙ তুলির সাহায্যে আকার-আয়তনে, কখনো আলোকচিত্রে ধূসর রঙে অথবা রূপ ও সারোৎসারে, কখনো বা সঙ্গীতে বিশুদ্ধ সুর রূপে অস্তিমান হয়ে ওঠে।

তবে এখানে আলোকচিত্রণে বিমূর্তিকরণের খানিকটা ইতিহাস না টেনে পারছি না। প্রথম যিনি উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে বিশুদ্ধ বিমূর্ত আলোকচিত্র সৃষ্টি করেছেন তিনি হচ্ছেন অ্যালভিন ল্যাংডন কোবার্ন। ১৯১৭ সালে ছোট ছোট বস্তুকে তিনটি আয়নার মাঝখানে যেমন দেখায় সেভাবে ক্যালিডোস্কপিকরূপে এক সঙ্গে আটকে (clamp) প্রতিচ্ছবি নির্মাণ করেছিলেন- যাকে তিনি বলেছেন- vortograph। তার পরের বছরই ক্রিস্টিয়ান স্যাড সমতল বস্তু ও তা থেকে কেটে নেওয়া টুকরাকৃতি (cut out) -কে সংবেদনশীল অবদ্রবে রেখে এবং আলোকসম্পাত করে schadograph তৈরি করেন। সে প্রতিচ্ছবি সে সময়কার cubic collage -এর অনুরূপ হয়েছিল। এরপর এই পদ্ধতি এবং আরো কয়েকটি পদ্ধতিকে ভিত্তি করে ক্যামেরা ছাড়াই ম্যান রে, মহোলী ন্যাগী প্রমুখ ১৯২২ সালে নতুন ধরনের ছবি সৃষ্টি করতে সমর্থ হলেন- যা rayograph  ও photogram নামে পরিচিত। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর বিমূর্ত পেইন্টিং- এর উত্তরোত্তর গ্রহনযোগ্যতার ফলে তখন আলোকচিত্রীরা এদিকটায় বেশি ঝুঁকে পড়েছিলেন। তার প্রধান কারণ সমকালীন চিত্রশিল্পের বিমূর্ততাকে ছাড়িয়ে উৎকর্ষ সাধন। বিমূর্তকরণের বিশেষ কৌশল তখন বিজ্ঞানীরা ল্যাবরেটরীর যন্ত্রপাতির সাহায্যে প্রয়োগ করতেন। এ রকম কৌশলের মধ্যে রয়েছে- x-ray photography, x-ray diffraction photography -যেখানে আলোকরশ্মির অপবর্তন নীতি(principle of diffraction) ও তাপমাত্রার তারতম্যকে কাজে লাগানো হয়। এছাড়া রয়েছে photomicrography- কারণ ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র জীবাণু আমরা স্বাভাবিক দৃষ্টিতে দেখতে পাই না; ফলে তা আলোকচিত্রণে বিধৃত হলে নতুন মাত্রা পায়। Astronomical photography এবং  electron micrography-ও এর অন্তর্ভুক্ত। এছাড়া সাধারণ ক্যামেরায় যখন অস্বাভাবিক ও অদ্ভূত দৃষ্টিকোণ থেকে আলোকচিত্রী ছবি তোলেন তা-ও ভিন্ন মাত্রা নিয়ে আসে- যা দর্শক হিসেবে আমরা সাধারণত আগে কখনও দেখি না বা দেখতে পাই না। তাই একেও বিমূর্ত আলোকচিত্রণের অন্তর্ভুক্ত করা চলে।

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*