ডেথ বাই ল্যান্ডস্কেপ – অনুবাদ

ডেথ-বাই-ল্যান্ডস্কেপ

ডেথ বাই ল্যান্ডস্কেপ

মূল: মার্গারেট এটউড

অনুবাদ: সেলিম মিয়া


সকাল বেলার জলাশয়টি ছিল একেবারে শান্ত। কাচের মতো স্বচ্ছ তলের ওপর দিয়ে হাঁসদুটো আলতোভাবে ভেসে গিয়েছিল। তাদের পিছনে ফেলে এসেছিল ভি আকৃতির চিহ্ন-পথ। যেন উড়ছিল। সূর্য ওপরে উঠলে গরম পড়েছিল। খুবই গরম। ক্যানোতে স্থায়ী মাছি ছিল, যেগুলো হাত বা পায়ে দ্রুত কামড় দেওয়ার জন্য বসছিল। লোয়াস বাতাসের আশা করেছিল।

তারা পরের ক্যাম্প এলাকায় মধ্যাহ্নভোজনের জন্য থেমেছিল। ক্যাম্পের নাম ছিল লুকআউট পয়েন্ট। যদিও এলাকাটা শিলার সমতল অবস্থানে পানির কাছাকাছি নিচে ছিল, তবু যে এ রকম নামকরণ করা হয়েছিল তার কারণ নিকটেই খাড়া একটা চূড়া ছিল। আরও ছিল ওপরে যাওয়ার একটা পথ। ওপরটাই ছিল লুকআউট। যদিও সেখান থেকে যা দেখার কথা ছিল তা স্পষ্ট দেখা যেত না। কিপ বলেছিল যে, এটা শুধু দৃশ্য দেখা।

যে কোনও ভাবেই হোক ওপরে ওঠার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল লোয়াস ও লুসি। মধ্যাহ্নভোজনের জন্য অপেক্ষা করে ঘুরে বেড়াতে চায়নি তারা। রান্না করার পালাও ছিল না তাদের। যদিও রান্না না করে তারা খুব বেশি কিছু এড়ায়নি। কারণ মধ্যাহ্নভোজন রান্না করাটা বড় কোনও ব্যাপার ছিল না। শুধু পনির খুলে রুটি ও চীনা বাদাম বের করা। কিন্তু বনের কাজ-কর্ম প্যাট ও কিপকেই করতে হয়েছিল। নিজের চায়ের জন্য টিনের পাঁতিলে সিদ্ধ করতে হয়েছিল।

কিপকে বলেছিল তারা কোথায় যাচ্ছিল। আপনি কোথায় যাচ্ছেন সেটা কিপকে বলতে হত। সেটা যদি আগুন জ্বালানোর জন্য শুকনো ডালপালা যোগাড় করতে বনের মধ্যে একটু দূরেও যেতে হয় তবুও। সঙ্গী ছাড়া আপনি কোথাও কখনও যেতে পারবেন না।

আগুনে কাঠের খড়ি দিতে দিতে ও আগুন তপাতে তপাতে কিপ বলেছিলেন, ‘নিশ্চয়ই। মধ্যাহ্নভোজনের পনের মিনিট আছে।‘

জলাশয় থেকে টিনের পাঁতিলটিতে পানি ভরিয়ে আসতে আসতে প্যাট বলেছিলেন, ‘ওরা কই যায়?’

কিপ বলেছিলেন, ‘লুকআউটে।‘

প্যাট বলেছিলেন, ‘সাবধানে যাও।‘ কী যেন ভেবে পরে বলেছিল সে। এর কারণ সে সব সময় এমনই বলত।

কিপ বলেছিলেন, ‘তারা পেকে ঝুনা হয়ে গেছে।‘

লোয়াস তার ঘড়ির দিকে তাকায়। বারোটা বাজতে দশ মিনিট বাকি। সময় বলার দায়িত্বটা তার। লুসি সময়ের ব্যাপারে উদাসীন। শুষ্ক মাটি ও শিলা, বড় বড় গোলগাল গোলাপি-ধূসর বোল্ডার কিংবা অমসৃণ কিনারাসহ ফেটে খুলে যাওয়া বোল্ডারের উপর দিয়ে তারা হাঁটে। পথের দু’পাশে মলম গাছ ও চিরহরিৎ গাছ জন্মে আছে। জলাশয়টির বামে নীল নীল টুকরো। সূর্যটা ঠিক মাথার ওপরে। কোথাও কোনও ছায়া নেই। তাদের ওপর থেকে এবং নিচ থেকে তাপ লাগছে। বনটি শুষ্ক হয়ে চড়চড় করে ফুটছে।

দূরে নয়, তবে খাড়া আরোহণ। চূড়ায় পৌঁছলে তারা ঘামতে থাকে। খালি হাত দিয়ে তারা মুখ মোছে। তীব্র গরম শিলার ওপর নিঃশব্দে বসে পড়ে। শিলাখণ্ডটি কিনারা থেকে পাঁচ ফুট, তবে লোয়াসের খুব কাছে। ডানেই লুকআউটটি। একেবারে জলাশয়ের দিকে নিচে পানির ওপরে সুদীর্ঘ দৃশ্য। এর পিছনের পথে তারা এসেছে। লোয়াসের কাছে এটা আশ্চর্যজনক লাগছে যে, ঐসব পানি ছাড়িয়ে তারা এত দূর ঘুরে এসেছে, যে পথে তাদের নিজেদের হাত ছাড়া আর অন্য কোনও কিছুই তাদের চালিত করেনি। এটা ভেবে সে শক্তিশালী অনুভব করে। সব ধরণের জিনিসই সে করতে সক্ষম।

লুসি বলে, ‘এখান থেকে পুরো একটা ঝাঁপ দেওয়া যাবে।‘

লোয়াস বলে, ‘তোমাকে পাগল হতে হবে।‘

লুসি বলে, ‘কেন? আসলেই গভীর। সোজা নিচে চলে গেছে।‘  দাঁড়িয়ে কিনারার কাছে এক পা এগোয় সে। তলপেটে একটা চোট লাগে লোয়াসের, যে ধরণের চোট লাগে উঁচু কোনও কিছুর ওপর দিয়ে গাড়ি দ্রুত গেলে। বলে, ‘দিও না।‘

লোয়াসের দিকে দুষ্ট চাহনিতে তাকিয়ে লুসি বলে, ‘কী দিব না?’ সে জানে উচ্চতার ব্যাপারে লোয়াস কেমন অনুভব করে। তবে সে ফিরে আসে। বলে, ‘আমার তো প্রস্রাব চেপেছে।

লোয়াস যে কখনও টয়লেট পেপার ছাড়া থাকে না, সে বলে, ‘টয়লেট পেপার আছে?’ বলে নিজের শর্টসের পকেটে খুঁজতে থাকে।

লুসি বলে, ‘ধন্যবাদ।‘

বনের মধ্যে প্রস্রাব করতে তারা দুজনেই ওস্তাদ। আন্ডারওয়্যার টেনে হাঁটুর মধ্যে এনে তারা দ্রুত কাজটি করে যাতে মশা আক্রমণ না করে বসে। আর পাহাড়ের নিচের দিকে মুখ করে উবু হয়ে বসে পায়ের পাতাদুটো ছড়িয়ে বসে যাতে করে পা ভিজে না যায়। পাছা দেখানোর এ অনুভূতি যেন কেউ পিছন থেকে দেখছে। অন্য কারও সাথে থাকলে রীতিটা হল না তাকানো। লোয়াস দাঁড়িয়ে পথের দিকে হাঁটা শুরু করে দৃষ্টির বাইরে চলে যায়।

লুসি বলে, ‘আমার জন্য অপেক্ষা করো।‘

লোয়াস নিচে নেমে এসেছিল বোল্ডারগুলোর ওপর দিয়ে এবং পাশ দিয়ে। এসেছিল যতক্ষণ পর্যন্ত না সে লুসিকে দেখতে পায়। অপেক্ষা করেছিল সে। নিচে তীরের কাছে অন্যদের কণ্ঠস্বর, কথা বলা ও হাসাহাসি শুনতে পাচ্ছিল সে। একটা কণ্ঠস্বর থেকে চিৎকার শুনছিল, ‘পিঁপড়া! পিঁপড়া!’ পিঁপড়ার ঢিবির ওপর কেউ অবশ্যই বসে থাকবে। বনের মধ্যে দূরে এক পাশে একটা দাঁড়কাক ডাকছিল একটানা কর্কশ স্বরে।

ঘড়ির দিকে তাকিয়েছিল সে। দেখে দুপুর। এ সময়েই সে চিৎকারটা শুনেছিল।

এরপর থেকে চিৎকারটা মনে মনে এতবার যাচাই করেছে সে যে প্রথম আসল চিৎকারটা নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। যেন একটা পদচিহ্ন অন্য পদচিহ্নে পদদলিত হয়ে গেছে। তবে সে নিশ্চিত যে (প্রায় নিশ্চিত) চিৎকারটা ভয়ের ছিল না। উচ্চ চিৎকার না। অনেকটা বিস্ময়ের কান্নার মতো, খুব দ্রুতই ছেদ ঘটে। সংক্ষিপ্ত, যেন কুকুরের ডাক।

লোয়াস বলেছিল, ‘লুসি?’ তারপর ডেকেছিল, ‘লুসি!’ এরই মধ্যে পাথরের পথ ধরে সে পিছনে যাচ্ছিল। লুসি সেখানে ছিল না। কিংবা দৃষ্টিসীমায় ছিল না।

লোয়াস বলেছিল, ‘দুষ্টামি করো না। খাবার সময় হয়ে গেছে।‘ কিন্তু শিলার পিছন থেকে লুসি জেগে ওঠেনি কিংবা গাছের পিছন থেকে হাসতে হাসতে বের হয়ে আসেনি। চারদিকে রোদ ছিল। শিলাখণ্ডগুলিকে শাদা দেখাচ্ছিল। লোয়াস বলেছিল, ‘ফাইজামি করো না।‘ আর বিষয়টা ফাইজলামি ছিল না। আতঙ্ক তাকে গ্রাস করছিল। সেই আতঙ্ক যা ছোট্ট একটা বাচ্চাকে গ্রাস করে যে বাচ্চা জানে না বড়রা কোথায় লুকিয়ে আছে। লোয়াস তার নিজের মনকে শুনতে পাচ্ছিল। দ্রুত একবার চোখ বুলিয়েছিল আশপাশে। মাটিতে শুয়ে পড়েছিল। আর চূড়ার কিনারের দিকে তাকিয়েছিল। তার রক্ত হিম হয়ে গিয়েছিল। কোনও কিছুই ছিল না।

পথ ধরে ফিরে গিয়েছিল সে। হোঁচট খেয়েছিল। খুব দ্রুত নিঃশ্বাস নিচ্ছিল। এত ভয় পেয়েছিল যে কাঁদতে পারেনি। ভয়ানক অনুভব করেছিল। নিজেকে অপরাধী ও হতাশ লেগেছিল, যেন ভুল করে সে কিছু একটা করেছে। এমন কিছু করেছে যার মাশুল দেওয়া যায় না। কিপকে বলেছিল, ‘লুসি চলে গেছে।‘

বিরক্ত হয়ে তার অগ্নিস্থান থেকে মুখ তুলে তাকিয়েছিলেন কিপ। টিনের পাত্রটিতে পানি ফুটছিল। তিনি বলেছিলেন, ‘চলে গেছে মানে কী বলতে চাচ্ছ? কোথায় গেল?’

লোয়াস বলেছিল, ‘জানি না। গেছে শুধু এই জানি।‘

কেউই চিৎকারটা শোনেনি। আবার লোয়াসের ডাকও কেউ শোনেনি। পানির পাশে তারা নিজেদের মধ্যে কথা বলছিল।

লুকআউটে গিয়ে কিপ ও প্যাট খুঁজেছিলেন, ডাক দিয়েছিলেন এবং শিস বাজিয়েছিলেন। কোনও উত্তর আসেনি।

তারপর তারা নিচে নেমে এসেছিল। আর লোয়াসের বলতে হয়েছিল ঠিক কী ঘটেছিল। অন্য মেয়েরা গোল হয়ে বসে তার কথা শুনেছিল। কেউ কিছু বলেনি। তাদের সবাইকে ভীত-সন্ত্রস্ত মনে হয়েছিল, বিশেষ করে প্যাট ও কিপকে। এ দুজন ছিলেন নেত্রী। কোনও কারণ ছাড়াই এভাবে একজন ক্যাম্পারকে হারানো তো ঠিক না।

কিপ বলেছিলেন, ‘তাকে একা ছেড়ে দিয়েছিলে কেন?’

লোয়াস বলেছিল, ‘আমি তো শুধু নিচে নামছিলাম। আপনাকে বলেছিলাম না যে, তার বাথরুমে যেতে হয়েছিল।‘ নিজের চেয়ে বড় অন্যদের সামনে সে প্রস্রাব বলেনি।

কিপকে বিতৃষ্ণ মনে হয়েছিল।

একজন মেয়ে বলেছিল, ‘হয়ত বনের মধ্যে হেঁটে চলে গেছে সে। হেঁটে উল্টো পথে গেছে।‘

আরেক মেয়ে বলেছিল, ‘হয়ত ইচ্ছে করেই সে এটা করছে।‘

কেউই এসব তত্ত্বকথা বিশ্বাস করেনি।

ক্যানো নৌকাগুলো নিয়ে তারা চূড়ার পাদদেশের চারপাশটায় অনুসন্ধান চালিয়েছিল। পানির নিচে দেখেছিল। কিন্তু শিলাখণ্ড পড়ার কোনও আওয়াজ হয়নি। পানি ছিটকে পড়ার শব্দও হয়নি। কোনও ইঙ্গিতেই ছিল না মোটেও। লুসি একেবারে হাওয়ায় মিলে গিয়েছিল।

ক্যানো ভ্রমণের সেটাই ছিল সমাপ্তি। যদিও তাদের একজন প্যাডলারের ঘাটতি ছিল, তবু যেতে যে দু’দিন লেগেছিল ফিরে আসতেও সেই দু’দিন লেগেছিল। ফেরার সময় তারা কোনও গান গায়নি।

তারপর কুকুরসহ মোটরবোটে করে পুলিশ গিয়েছিল। পুলিশরা ছিল মাউন্টিজ এবং কুকুরগুলো ছিল জার্মান শেফার্ড। বনের মধ্যে পথ অনুসরণ করতে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত। কিন্তু ঘটনার পর থেকে বৃষ্টি হয়েছিল। আর তারাও কিছু খুঁজে পায়নি।

লোয়াস ক্যাপির অফিসে বসে আছে। কেঁদে কেঁদে তার মুখখানি ফুলে গেছে। আয়নায় সেটা দেখেছে সে। এখন নাগাদ সে অসাড় বোধ করছে। বোধ করছে যেন সে ডুবে গেছে। এখানে আর থাকা চলে না। আঘাতটা খুব বেশি হয়ে গেছে। আগামীকাল তার বাবা-মা আসবেন তাকে নিয়ে যেতে। ক্যানো ভ্রমণে যাওয়া কিছু মেয়েকেও নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। বাকিদের থেকে যেতে হবে। কারণ তাদের বাবা-মা ইউরোপে আছেন কিংবা আসতে পারবেন না।

ক্যাপি গম্ভীর হয়ে আছে। ঘটনাটিকে তারা গোপন করার চেষ্টা করেছে। কিন্তু ক্যাম্পের সবাই তো জানে। পত্রিকাতেও শীঘ্রই প্রকাশিত হবে। আপনি এটা চুপ করে রাখতে পারেন না। কিন্তু কী বলা যায়? এমন কী বলা যায় যার মানে থাকে? প্রকাশ্য দিবালোকে একজন মেয়ে হাওয়া হয়ে গেল কোনও চিহ্ন ছাড়াই।‘ এটা বিশ্বাস করা যায় না। অন্য জিনিস, আরও খারাপ জিনিস সন্দেহ করা হবে। নিদেনপক্ষে অবহেলা। কিন্তু তারা তো সব সময় এমন সাবধান থেকেছে। কুয়াশার মতো দুর্ভাগ্য ক্যাম্প ম্যানিটোকে ঘিরে ধরবে। পিতামাতারা এ ক্যাম্পকে এড়িয়ে অন্য সৌভাগ্যপূর্ণ ক্যাম্পে যাবে। লোয়াস দেখতে পাচ্ছে অসাড়তার মধ্যেও ক্যাপি এসব ভাবছে। এ ভাবনাই যে কেউ ভাববে।

ক্যাপির অফিসে পুরাতন কাঠের টেবিলের পাশে শক্ত কাঠের চেয়ারে বসে আসে লোয়াস। টেবিলটার ওপর ঝুলে আছে ক্যাম্পের স্বাভাবিক রুটিনের পিন মারা বুলেটিন বোর্ড। ফোলা চোখের পাতায় লোয়াস এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে ক্যাপির দিকে। ক্যাপি এখন হাসছে। হাসিটা আশ্বস্তজনক হাসি। তার ব্যবহার খুবই সাধারণ। কিছু একটার পিছে আছে সে। নিষিদ্ধ চকোলেটের গন্ধ শোঁকার সময়, রাতের ক্যাবিন থেকে গোপনে চলে হওয়ার গুজব যারা ছড়িয়েছিল তাদের খুঁজে বের করার সময় ক্যাপির মুখে এমন অভিব্যক্তি দেখেছে লোয়াস।

ক্যাপি বলে, ‘শুরু থেকে আবার বলো আমাকে।‘

লোয়াস তার গল্প এই নিয়ে এত বার বলেছে প্যাট ও কিপকে, ক্যাপিকে, পুলিশকে যে গল্পটা সে অক্ষরে অক্ষরে জানে। সে জানে, কিন্তু এতে তার বিশ্বাস নেই আর। এটা এখন গল্প হয়ে গেছে। সে বলেছিল, ‘তোমাকে বলেছিলাম না যে, সে বাথরুমে যেতে চেয়েছিল। আমার টয়লেট পেপার তাকে দিয়েছিলাম। নিচে নেমেছিলাম। তার জন্য অপেক্ষা করেছিলাম। তারপর শুনলাম এই ধরণের চিৎকার…’

আস্থার হাসি হেসে ক্যাপি বলে, ‘হ্যাঁ, কিন্তু তার আগে। কী কথা হয়েছিল তোমাদের মধ্যে?’

লোয়াস চিন্তা করে। আগে কেউ তাকে এ প্রশ্ন জিজ্ঞেস করেনি। ‘সে বলেছিল তুমি সেখান থেকে ঝাঁপ দিতে পারবে। বলেছিল এটা সোজা নিচে চলে গেছে।‘

‘আর তুমি কী বলেছিলে?’

‘বলেছিলাম তোমার পাগল হতে হবে।‘

উৎসাহব্যঞ্জক কণ্ঠে ক্যাপি বলে, ‘লুসির প্রতি তুমি পাগল ছিলে?’

লোয়াস বলে, ‘না, আমি কেন লুসির প্রতি পাগল হব? কখনও লুসির প্রতি পাগল ছিলাম না।‘ আবার তার কান্না পাচ্ছে। যে সময়গুলোতে সে লুসির প্রতি আসলেই পাগল ছিল সে সময়গুলো ইতোমধ্যেই মুছে গেছে। লুসি সব সময়ই নিখুঁত ছিল।

ক্যাপি যেন নিজেকে বলে, ‘মাঝে মাঝে আমরা রাগ করি যখন জানি না যে, আমরা রেগে আছি। মাঝে মাঝে আমরা আসলেই পাগল হয়ে যাই। আর আমরা সেটা জানিও না। মাঝে মাঝে এমন কিছু করি যা করতে চাইনি কিংবা কী ঘটবে সেটা না জেনেই করি। মেজাজের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারাই।‘

লোয়াসের বয়স কেবল তের। কিন্তু ক্যাপি যে এসবের কিছুতে নিজেকে অন্তর্ভূক্ত করছে না সেটা বুঝতে তার বেশি সময় লাগে না। আমরা বলতে সে লোয়াসকে বুঝিয়েছে। চূড়া থেকে লুসিকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেওয়ার অভিযোগে লোয়াসকে অভিযুক্ত করছে সে। এ অবিচার লোয়াসের কাছে চড়ের মতো লাগে। বলে, ‘আমি দেইনি!’

নরম সুরে ক্যাপি বলে, ‘কী দেওনি? কী দেওনি লোয়াস?’

সব চেয়ে খারাপ জিনিসটা করে লোয়াস। কাঁদতে শুরু করে সে। ছোঁ মারার মতো করে ক্যাপি তার দিকে তাকায়। সে যা চেয়েছিল তা সে পেয়েছে।

পরে লোয়াস যখন বড় হয়েছিল, তখন সে বুঝতে পেরেছিল এ সাক্ষাৎকারটা কী বিষয়ে ছিল। ক্যাপির অধৈর্য, গল্পের প্রয়োজন, কারণসহ একটা বাস্তব গল্প দেখতে পেয়েছিল সে। লুসি তার মোকাবেলা করার জন্য যে অচেতন শূন্যতা রেখে গিয়েছিল সেটা ছাড়া যে কোনও কিছুই দেখতে পেয়েছিল সে। ক্যাপি চেয়েছিল লোয়াস কারণটা বলে দিক, নিজেই কারণটা হোক। সেটা পত্রিকার জন্যও ছিল না বাবা-মায়ের জন্যও ছিল না। কারণ প্রমাণ ছাড়া এমন অভিযোগ কখনও করতে পারত না সে। সেটা ছিল তার নিজের জন্য। ক্যাম্প ম্যানিটোর ক্ষতি এবং সে যা যা কাজ করত তার ব্যাখ্যা করতে কিছু একটার প্রয়োজন ছিল। নষ্ট ছেলেমেয়েদের বিনোদন দেওয়ার এবং পিতামাতাদের তেল মেরে তার নিজের চুলে পালক গুঁজে নিজেকে বোকা বানানোর বছরগুলোর জন্য। ক্যাম্প ম্যানিটো আসলে হারিয়ে গিয়েছিল। টেকেনি।

বিশ বছর পর লোয়াস এসব বের করেছিল। কিন্তু তখন খুব দেরি হয়ে গিয়েছিল। এমনকি দশ মিনিট পরে যখন সে ক্যাপির অফিস থেকে বের হয়ে ক্যাবিনের দিকে ফিরে জিনিসপত্র ব্যাগে গুছানোর জন্য ধীরে ধীরে হেঁটেছিল সেই সময়টাতেও খুব বেশি দেরি হয়ে গিয়েছিল। লুসির কাপড়-চোপড় তখনও ভাঁজ করা অবস্থায় তাকে ছিল, যেন অপেক্ষা করছিল। তার মনে হয়েছিল ক্যাবিনের অন্য মেয়েরা তাদের চোখে জল্পনা-কল্পনা নিয়ে তাকে লক্ষ করছিল। সে কি কাজটা করতে পারে? অবশ্যই সে-ই করে থাকবে। তার বাকি জীবন সে দেখেছে এভাবে লোকজন তার দিকে লক্ষ করছে।

হয়ত তারা এটা ভাবছিল না। হয়ত তার জন্য তারা শুধুই দুঃখ প্রকাশ করেছিল। কিন্তু তার মনে হয়েছিল যে, বিচার করার পর তাকে শাস্তি দেওয়া হয়েছিল। আর এটাই তার সাথে থেকে গিয়েছে। থেকে গিয়েছে জ্ঞানটা যা সে বাছাই করে নিয়েছিল। দোষারোপ করা হয়েছে এমন কিছুর জন্য যেখানে তার কোনও দোষ ছিল না।

নিজের অ্যাপার্টমেন্টের ড্রয়িং রুমে বসে এক কাপ চা পান করছে লোয়াস। হাঁটু থেকে ছাদ অবধি জানালার মধ্য দিয়ে লেক অন্টারিওর প্রশস্থ দৃশ্য দেখছে সে। দেখছে কুঞ্চিত নীল-ধূসর আলোর ত্বক। দেখছে বাতাসে কাঁপা সেন্টার আইল্যান্ডের উইলো গাছগুলো। যদিও এত দূরে ও কাচের এ পাশে বাতাস স্থির হয়ে আছে। অতিমাত্রায় দূষণ না থাকলে সে দূরবর্তী উপকূল, অচেনা উপকূল দেখতে পায়, যদিও আজকে তা দেখা যাচ্ছে না।

সম্ভবত বাইরে যেতে পারত সে। যেতে পারত নিচ তলায়। কিছু কেনাকাটা করতে পারত। ফ্রিজে বেশি কিছু্ও নেই। ছেলেরা বলে যে, সে বাইরে যথেষ্ট বের হয় না। কিন্তু সে তো ক্ষুধার্ত না। আর এ জায়গা থেকে চলাফেরা করতে, নড়াচড়া করতে দিনে দিনে চেষ্টার প্রয়োজন হচ্ছে।

এখন তার প্রায় মনেই নেই যে, তার দুটো ছেলে হাসপাতালে আছে, শিশু হিসেবে তাদের সেবা-যত্ন করেছে। সে যে বিয়ে করেছে কিংবা রব দেখতে কেমন ছিল তাও প্রায় মনে নেই। এমনকি যখন সে কিছুই অনুভব করেনি তখনও পূর্ণ মনোযোগ দিচ্ছিল। অনেক ক্লান্ত ছিল সে, যেন একটা না দুটো জীবন যাপন করছিল। তার নিজের জীবন এবং আরেকটা হলো তাকে ঘিরে ছায়াময় জীবন যা উপলব্ধিতে আসেনি, যা যাপিত হতে পারত লুসি যদি পাশ থেকে পড়ে না যেত এবং সময় থেকে অদৃশ্য হয়ে না যেত।

রবের পারিবারিক কুটিরে কিংবা বন্য জলাশয় ও বন্য গাছ-গাছালি এবং লুন হাসেঁর জায়গায় উত্তরের দিকে সে কখনই যাবে না। কাছাকাছি কোথাও যাবে না। তবুও যেন সব সময় সে আরেকটা কণ্ঠ শুনছিল। এমন এক ব্যক্তির কণ্ঠ যার সেখানে থাকা উচিৎ ছিল, কিন্তু নেই। একটা প্রতিধ্বনি।

রব জীবিত থাকাকালে ছেলেগুলো যখন বড় হচ্ছিল, সে ভান করতে পারত যে, সে কিছু শোনেনি। শোনেনি শব্দের মধ্যকার এই শূন্য স্থানটা। কিন্তু এখন মনোযোগ অন্য দিকে নেওয়ার মতো তেমন কিছুই আর নেই।

জানালা থেকে মুখ ফিরিয়ে তার ছবিগুলোর দিকে তাকায় সে। জলাশয়ের মধ্যে ইষৎ গোলাপি দ্বীপ আছে। দ্বীপে একে অপরকে জড়িয়ে থাকা গাছ-গাছালি আছে। এই ভূ-দৃশ্যের মধ্য দিয়েই তারা ক্যানো চালিয়ে গিয়েছিল সেই দূরের গ্রীষ্মে। এ দেশের ভ্রমণ-ছবি, এরিয়াল চিত্র সে দেখেছে। ওপর থেকে সব কিছু ভিন্ন দেখায়, বেশি বড় দেখায়, বেশি নৈরাশ্যজনক দেখায়—জলাশয়ের পর জলাশয়, গাঢ় সবুজ ঝোঁপে এলোপাথাড়ি জমে থাকা নীল নীল পানি, ব্রাশের দাঁতের মতো গাছপালা। সেখানে একবার কিছু হারিয়ে ফেললে আপনি কীভাবে তা কখনও ফিরে পাবেন? হয়ত যদি সবগুলোকে কেটে ফেলা যেত, নিংড়ে নিঃশেষ করা যেত, তাহলে কোনও এক সময় লুসির হাড়গোড় যেখানেই লুকানো থাক, তারা খুঁজে পেত। কয়েকটা হাড়গোড়, কিছু বোতাম, তার শর্টসের বাকল।

কিন্তু মৃত ব্যক্তি তো লাশ মাত্র। লাশ জায়গা দখল করে। কোথাও না কোথাও থাকে। আপনি তা দেখতে পারবেন। বাক্সে পুরে মাটিতে সমাহিত করলে মাটির ভেতর বাক্সেই এটা থাকবে। কিন্তু লুসি বাক্সে কিংবা মাটিতে নেই। কারণ সে নির্দিষ্ট কোথাও নেই। যে কোনও জায়গায় থাকতে পারে সে।

আর এই চিত্রকর্মগুলো ভূ-দৃশ্যের চিত্রকর্ম নয়। কারণ সেখানে কোনও ভূ-দৃশ্য নেই। পুরান, পরিচ্ছন্ন ইউরোপিয়ান অর্থে নেই। নেই নম্র পাহাড়, এঁকেবেঁকে চলা নদী, কুটির; নেই পটভূমিতে পর্বত, সোনালি আকাশ। আছে শুধু জটলা, অপসৃয়মান গোলক ধাঁ-ধাঁ, যেখানে পা রাখলেই আপনি প্রায় হারিয়ে যেতে পারেন। এসব চিত্রকর্মে কোনও পটভূমি নেই, কোনও ছায়াবীথি নেই। আছে কেবল অনেকটা জায়গা জুড়ে পুরোভূমি যা গাছ, ডালপালা ও শিলার বাঁকে বাঁকে আপনাকে জড়িয়ে পিছনে গেছে আর গেছে অনন্তভাবে। আপনি কত দূর পিছনে গেছেন সেটা কোনও ব্যাপার না, আরও থাকবে। আর গাছগুলি নিজেরা কদাচিৎ গাছ। এগুলো আছে তীব্র রঙে ভরপুর হয়ে শক্তির স্রোত হিসেবে।

লুসি অদৃশ্য হওয়ার ঠিক আগে চূড়ায় কতগুলো গাছ ছিল কে জানে? কেই-বা হিসেব করে রেখেছিল? হয়ত পরে আরও হয়েছিল।

চেয়ারে বসে লোয়াস নড়ে না। যে হাত দিয়ে কাপ ধরেছে তা তার মুখের দিকে মাঝামাঝি জায়গায় তোলা অবস্থায় আছে। কী যেন একটা শুনছে সে। শুনেই ফেলছে প্রায়—স্বীকৃতির বা আনন্দের চিৎকার।

চিত্রকর্মগুলোর দিকে তাকিয়ে সে ভালো করে দেখে। সেগুলোর প্রত্যেকটাই লুসির একেকটা ছবি। আপনি হুবহু তাকে দেখতে পাবেন না। কিন্তু সেখানে গোলাপি পাথরের দ্বীপের পিছনে কিংবা তারও পিছনে সে আছে। চূড়ার ছবিতে নিচের দিকে পতিত শিলায় সে ঢাকা পড়ে আছে। নদী তীরের ছবিটাতে উল্টানো ক্যানোর নিচে গুটিসুটি মেরে শুয়ে আছে। হলুদ শারদ বনে সে গাছের পিছনে আছে যা অন্য পুকুরের নীল অংশের পাশে ওপরের গাছ-গাছালির জন্য দেখা যায় না। কিন্তু আপনি যদি হেঁটে হেঁটে ছবিটির ভেতর ঢুকে গাছটি পেয়ে যান, তাহলে সেটা হবে ভুল গাছ। কারণ সঠিক গাছটি হবে আরও দূরে।

সবাইকেই কোথাও না কোথাও থাকতে হয়। আর সেই জায়গাটাতেই লুসি আছে। সে আছে লোয়াসের অ্যাপার্টমেন্টে। আছে দেয়ালের অন্তর্মুখী খোলা গর্তগুলোতে, জানালার মতো করে নয়, তবে দরজার মতো করে। এখানেই আছে সে। পুরোপুরি জীবিত আছে।

***পরিসমাপ্তি***


২য় পর্ব

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*